সৌদি আরব বিশ্বের বৃহত্তম প্রবাসী শ্রমবাজারগুলোর অন্যতম, যেখানে প্রায় ৩০ লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছেন। তবে অতীতে কাগজপত্রের অস্বচ্ছতা, দালালের মৌখিক প্রতিশ্রুতি এবং ভুয়া অফার লেটারের কারণে হাজার হাজার নিরীহ কর্মী সৌদি আরবে গিয়ে নির্ধারিত কাজ বা বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হতেন। এই শোষণ ও প্রতারণা বন্ধ করার লক্ষ্যে সৌদি সরকার তাদের ‘লেবার রিফর্ম ইনিশিয়েটিভ’ (LRI)-এর আওতায় শ্রমবাজারকে শতভাগ ডিজিটালাইজড করেছে। বর্তমানে দেশটিতে কোনো কাগুজে বা মৌখিক চুক্তির বৈধতা নেই; প্রতিটি কর্মীর কর্মসংস্থান সরাসরি সরকারি কিওয়া (Qiwa) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত হয়।

আপনি যদি সৌদি আরবে নতুন কাজের ভিসা নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তবে এজেন্সির মিষ্টি কথায় বিশ্বাস না করে সরকারি ডাটাবেজে আপনার ভিসা এবং কিওয়া চুক্তিপত্রটি কার্যকর আছে কিনা তা নিজের চোখে দেখে নেওয়া অপরিহার্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যেকোনো ভিসা অফিশিয়াল ডাটাবেজে অনুসন্ধানের প্রমিত নীতিমালা জানতে আমাদের অনলাইনে ভিসা চেক করার সঠিক নিয়মাবলী গাইডটি পড়ে নিতে পারেন। এছাড়া সৌদি আরবের সামগ্রিক ভিসা নির্দেশিকার সার্বিক তথ্য পেতে আমাদের সৌদি আরব ভিসা চেক নির্দেশিকা পেজটি আপনাকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে।


১. সৌদি কাজের ভিসা ও ডিজিটাল কিওয়া চুক্তিনামা (Qiwa E-Contract) পরিচিতি

সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় (HRSD) পরিচালিত সেন্ট্রাল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হলো ‘কিওয়া’ (Qiwa)। সৌদি আরবে বেসরকারি খাতে কার্যরত প্রতিটি ছোট, মাঝারি ও বৃহৎ কোম্পানিকে এই প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত হতে হয়। কোম্পানি যখন কোনো বিদেশি কর্মীকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য আবেদন করে, তখন কিওয়া সিস্টেমে একটি ইলেকট্রনিক কন্ট্রাক্ট (E-Contract) তৈরি করা বাধ্যতামূলক।

সৌদি কিওয়া প্ল্যাটফর্মে ইলেকট্রনিক শ্রমচুক্তি অডিট ইন্টারফেস
চিত্র ১: সৌদি মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কিওয়া পোর্টালে কাজের ডিজিটাল চুক্তিপত্র ভেরিফিকেশন

কিওয়া চুক্তিনামায় যে তথ্যগুলো সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত থাকে:

১. মূল পেশা (Job Profession / المهنة): পাসপোর্টে এবং ভিসায় যে পেশা উল্লেখ থাকবে, কিওয়া চুক্তিতে ঠিক সেই পেশার সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয় অনুমোদিত অকুপেশন কোড থাকতে হবে। ২. বেতন কাঠামো (Salary Breakdown): মূল বেতন (Basic Salary), আবাসন ভাতা (Housing Allowance), যাতায়াত ভাতা (Transport Allowance) এবং খাদ্য ভাতার সঠিক আর্থিক পরিমাণ সৌদি রিয়ালে (SAR) স্পষ্টভাবে লেখা থাকে। ৩. কর্মঘণ্টা ও সাপ্তাহিক ছুটি: সাধারণ কর্মঘণ্টা দৈনিক ৮ ঘণ্টা (সাপ্তাহিক ৪৮ ঘণ্টা) এবং প্রতি সপ্তাহে ১ দিন বাধ্যতামূলক বেতনসহ ছুটির বিধান চুক্তিতে সন্নিবেশিত থাকে। ৪. চুক্তির মেয়াদ: সাধারণত চুক্তিটি ১ বছর বা ২ বছর মেয়াদি হয়ে থাকে এবং মেয়াদ শেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নের শর্তাবলী উল্লেখিত থাকে।

তাকামল (Takamol) পেশাগত দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা:

সৌদি সরকারের নতুন নিয়মানুযায়ী ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, কার্পেন্টার, মেকানিক বা পেইন্টারসহ ২৩টিরও বেশি টেকনিক্যাল পেশায় সৌদি আরবে যেতে হলে ‘তাকামল’ (Skill Verification Program - SVP) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ঢাকায় বাংলাদেশ সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে (TTC) এই ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রার্থীর দক্ষতা পরীক্ষার সনদ সরাসরি সৌদি কিওয়া সার্ভারের সাথে যুক্ত থাকে। এই টেস্টে উত্তীর্ণ না হলে সৌদি দূতাবাস কোনোভাবেই কর্মীর পাসপোর্টে কাজের ভিসা ইস্যু করে না।


২. কিওয়া প্ল্যাটফর্মে কর্মসংস্থান চুক্তিপত্র যাচাই ও অনুমোদনের অনলাইন পদ্ধতি

কিওয়া প্ল্যাটফর্মে অফার লেটার ও চুক্তিপত্র যাচাই করার জন্য আপনার কাছে কাফিলের দেওয়া চুক্তিপত্রের রেফারেন্স আইডি বা আপনার পাসপোর্ট নম্বর থাকতে হবে।

ভিসা চেক অ্যাপে সৌদি কাজের ভিসা ও কিওয়া নির্বাচন মেন্যু
চিত্র ২: ভিসা চেক অ্যাপের মাধ্যমে কাজের ভিসা ও কিওয়া কন্ট্রাক্ট গেটওয়ে নির্বাচন

ধাপে ধাপে কিওয়া চুক্তিপত্র অনুসন্ধান করার নিয়ম:

  • ধাপ ১: আমাদের বিশেষায়িত ভিসা চেক অ্যাপ ওপেন করুন অথবা ব্রাউজারে সরাসরি qiwa.sa পোর্টালে প্রবেশ করুন।
  • ধাপ ২: হোমপেজ থেকে ‘Services’ অপশনে গিয়ে ‘Verify Employment Contract’ বা ‘শ্রমচুক্তি যাচাই’ অপশনটি বেছে নিন।
  • ধাপ ৩: নির্ধারিত বক্সে প্রার্থীর পাসপোর্ট নম্বর (Passport Number) অথবা এজেন্সির সরবরাহকৃত কন্ট্রাক্ট অথেন্টিকেশন নম্বর টাইপ করুন।
  • ধাপ ৪: আপনার জন্মতারিখ (দিন/মাস/বছর) নির্বাচন করুন এবং জাতীয়তা ড্রপডাউন থেকে ‘Bangladesh’ সিলেক্ট করুন।
  • ধাপ ৫: সার্চ বাটনে চাপ দিলে স্ক্রিনে সরাসরি সৌদি কোম্পানিটির নাম, কমার্শিয়াল রেজিস্ট্রেশন (CR), আপনার পদবী এবং বেতনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণী ভেসে উঠবে।

যদি চুক্তির শর্তাবলীতে দালালের প্রতিশ্রুতির সাথে কোনো অমিল দেখতে পান (যেমন দালাল বলেছিল ২০০০ রিয়াল, কিন্তু কিওয়া কন্ট্রাক্টে মূল বেতন লেখা আছে ১০০০ রিয়াল), তবে কখনোই চুক্তিতে সম্মতি প্রদান করবেন না বা বিদেশে যাওয়ার জন্য টাকা দেবেন না।

মুদাদ (Mudad) ওয়েজ প্রোটেকশন সিস্টেম ও বেতন নিরাপত্তা:

সৌদি আরবে বর্তমানে কোনো কোম্পানি কর্মীকে নগদ বা ক্যাশ টাকায় বেতন দিতে পারে না। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক (SAMA) এবং মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত ‘মুদাদ’ (Mudad) ওয়েজ প্রোটেকশন সিস্টেমের মাধ্যমে সরাসরি শ্রমিকের সৌদি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল মাধ্যমে বেতন পাঠাতে হয়। যদি কোনো কোম্পানি টানা দুই মাস কোনো কর্মীর বেতন প্রদানে ব্যর্থ হয়, তবে কিওয়া সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোম্পানিকে লাল তালিকাভুক্ত করে এবং কর্মী চাইলে কোনো প্রকার কাফিলের অনুমতি ছাড়াই অন্য কোম্পানিতে বিনা খরচে কাফালা (কাজের স্থান পরিবর্তন) হওয়ার আইনি অধিকার লাভ করেন।

গৃহকর্মী বা ব্যক্তিগত ড্রাইভারদের জন্য কিওয়া নয়, বরং বিশেষায়িত মুসানেদ প্ল্যাটফর্ম প্রযোজ্য। সেই সংক্রান্ত নিয়ম জানতে আমাদের সৌদি মুসানেদ ভিসা ও গৃহকর্মী চুক্তি গাইড বিস্তারিত পড়ুন।


৩. ভিসা চেক অ্যাপের সাহায্যে মোফা ও কাফিল কমার্শিয়াল সিআর ভেরিফিকেশন

কাজের ভিসার সত্যতা কেবল চুক্তির ওপর নির্ভর করে না; নিয়োগকারী কোম্পানিটি সৌদি আরবে সচল আছে কিনা এবং তাদের লাইসেন্স বৈধ কিনা তাও যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো কাফিল বা কোম্পানি যদি লাল তালিকাভুক্ত (Red Category) হয়, তবে তাদের ভিসায় সৌদি আরবে প্রবেশ করলে ইকামা হয় না।

সৌদি কাফিল ও কোম্পানির কমার্শিয়াল রেজিস্ট্রেশন সিআর নম্বর যাচাই
চিত্র ৩: সৌদি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডাটাবেজে কাফিলের কমার্শিয়াল লাইসেন্স (CR) নিরীক্ষা

কোম্পানির বৈধতা যাচাইয়ের প্রধান ৩টি সিগন্যাল:

১. সিআর নম্বর (Commercial Registration - CR): সৌদি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইস্যুকৃত ১০ ডিজিটের সিআর নম্বর প্রতিটি বৈধ কোম্পানির থাকে। এটি কোম্পানির লাইসেন্স পরিচিতি। ২. মোফা পোর্টালে স্পনসরের নাম মিল: সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভিসা পোর্টালে পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে সার্চ করলে যে স্পনসরের নাম বা প্রতিষ্ঠানের নাম দেখাবে, কিওয়া কন্ট্রাক্টেও অবিকল সেই নাম থাকা বাধ্যতামূলক। ৩. কোম্পানির নীতাকাত (Nitaqat) কালার ক্যাটাগরি: সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী কোম্পানিটি প্লাটিনাম বা সবুজ ক্যাটাগরিতে (Green Category) থাকতে হবে। লাল তালিকাভুক্ত কোম্পানি নতুন কর্মীর ইকামা বানাতে পারে না।

ধর্মীয় সফর ও ওমরাহ পালনের জন্য যারা ট্র্যাকিং করতে চান, তারা সৌদি ওমরাহ ও ট্যুরিস্ট ভিসা চেক গাইড দেখে নিতে পারেন।


৪. ওয়াফিদ গামকা মেডিকেল ফিটনেস ও দূতাবাস স্ট্যাম্পিং স্ট্যাটাস ট্র্যাকিং

কাজের ভিসা স্ট্যাম্পিংয়ের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো জিসিসি অনুমোদিত সেন্টারে শারীরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করা। পূর্বে এটিকে ‘গামকা’ (GAMCA) বলা হলেও বর্তমানে এটি সম্পূর্ণ ডিজিটালভাবে ‘ওয়াফিদ’ (Wafid) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

ওয়াফিদ গামকা মেডিকেল ফিটনেস রিপোর্ট ও ল্যাব স্ট্যাটাস যাচাই
চিত্র ৪: ওয়াফিদ অফিশিয়াল পোর্টালে মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেটের অনলাইন ভ্যালিডেশন

মেডিকেল রিপোর্ট যাচাইয়ের নিয়ম:

আমাদের বিশেষায়িত মেডিকেল রিপোর্ট চেক টুল ব্যবহার করে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে জেনে নিতে পারেন আপনার স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফলাফল সৌদি সার্ভারে সিঙ্ক হয়েছে কিনা:

  • Fit (ফিট): কর্মী সম্পূর্ণ সুস্থ এবং তার শরীরে সংক্রামক কোনো রোগের জীবাণু নেই। মেডিকেল রিপোর্ট অনলাইনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঢাকার সৌদি দূতাবাসে ট্রান্সফার হয়ে যায়।
  • Unfit (আনফিট): কোনো জটিল শারীরিক ত্রুটি বা সংক্রামক ব্যাধি ধরা পড়লে আনফিট ঘোষণা করা হয়। এই অবস্থায় কোনো এজেন্সি দূতাবাসে ভিসা জমা দিতে পারে না।
  • In-Progress: পরীক্ষার নমুনা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষারত রয়েছে। সাধারণত ৩ থেকে ৫ কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ফলাফল ডাটাবেজে হালনাগাদ হয়।

মেডিকেল ফিট সার্টিফিকেট এবং কিওয়া কন্ট্রাক্ট আপলোড হওয়ার পরই পাসপোর্ট ঢাকার সৌদি দূতাবাসে (Embassy of Saudi Arabia in Dhaka) ভিসা স্টিকার বা ইলেকট্রনিক ভিসা স্ট্যাম্পিংয়ের জন্য জমা হয়।


৫. বিএমইটি স্মার্ট কার্ড, ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্স ও ফ্লাইট প্রস্তুতি

ভিসা স্ট্যাম্পিং সম্পন্ন হলেই প্রবাসে যাত্রা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক।

সৌদি আরবের জন্য বিএমইটি স্মার্ট কার্ড ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট ক্লিয়ারেন্স
চিত্র ৫: জনশক্তি ব্যুরোর বিএমইটি স্মার্ট কার্ড ও বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট ক্লিয়ারেন্স

বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সের গুরুত্বপূর্ণ ধাপসমূহ:

১. বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট: জেলা কর্মসংস্থান কার্যালয়ে গিয়ে হাতের ১০ আঙুলের ছাপ দেওয়া। ২. প্রাক-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন (PDO): সৌদি আরবের সংস্কৃতি, ভাষা, ট্রাফিক আইন ও কাজের নিয়ম নিয়ে ৩ দিনের বাধ্যতামূলক ট্রেনিং সম্পন্ন করা। ৩. বিএমইটি স্মার্ট কার্ড ভেরিফিকেশন: আমাদের বিএমইটি কার্ড চেক টুল ব্যবহার করে সরাসরি কিউআর কোড স্ক্যান করে নিশ্চিত হন আপনার স্মার্ট কার্ডটি আসল এবং ডাটাবেজে সক্রিয় রয়েছে।

বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে বিএমইটি স্মার্ট কার্ড স্ক্যান করে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া ছাড়া কোনো এয়ারলাইন্স সৌদিগামী যাত্রীকে বোর্ডিং পাস প্রদান করবে না।

সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর ইকামা ইস্যুর ৯০ দিনের সরকারি প্রটোকল:

সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (যেমন রিয়াদ কিং খালিদ বা জেদ্দা কিং আব্দুল আজিজ বিমানবন্দর) অবতরণের পর জাওয়াজাত ইমিগ্রেশন ডেস্কে কর্মীর পাসপোর্টে একটি বিশেষ আরবি সিল ও হাতে লেখা ১০ ডিজিটের ‘বর্ডার নম্বর’ (Border Number বা رقم الحدود) দেওয়া হয়। এই বর্ডার নম্বরটি হলো সৌদি আরবে কর্মীর প্রথম আইনি ট্র্যাকিং পরিচয়।

সৌদি শ্রম আইন অনুসারে দেশটিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে স্পনসর বা কোম্পানিকে নিজ খরচে কর্মীর ডিজিটাল ইকামা তৈরি করে দিতে হয়। এর জন্য যা যা আবশ্যক:

  • সৌদি স্থানীয় মেডিকেল পরীক্ষা: সৌদি আরবের অনুমোদিত কোনো ক্লিনিক থেকে সংক্রামক রোগ ও ড্রাগ স্ক্রিনিং সম্পন্ন করা (এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সিঙ্ক হয়)।
  • মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স সক্রিয়করণ: ‘কাউন্সিল অব হেলথ ইন্স্যুরেন্স’ (CCHI) ডাটাবেজে কর্মীর নামে ন্যূনতম কভারেজ সম্বলিত হেলথ পলিসি সক্রিয় থাকা।
  • মুকিম (Muqeem) বা আবশির পোর্টালে ইকামা প্রিন্ট: কোম্পানি জাওয়াজাত ফি পরিশোধ করে মুকিম সিস্টেমের মাধ্যমে প্লাস্টিক ইকামা কার্ড ইস্যু করে কর্মীর হাতে তুলে দিতে বাধ্য। ইকামা হাতে পাওয়ার পর কর্মী তার নিজস্ব মোবাইল নম্বরে ‘Absher’ ও ‘Tawakkalna’ অ্যাপ সচল করে ব্যাংকে সেভিংস একাউন্ট খুলে বৈধভাবে রেমিট্যান্স পাঠানোর পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করেন।

৬. ভুয়া কাজের অফার লেটার ও জাল ভিসা শনাক্তকরণে করণীয়

দালাল চক্র কম্পিউটার কম্পোজ করা মনগড়া অফার লেটার এবং আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে কর্মীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। তবে সামান্য সচেতনতা অবলম্বন করলেই দালালদের জাল ভিসা শনাক্ত করা সম্ভব।

ভুয়া জব অফারের সাধারণ লক্ষণসমূহ:

  • হোয়াইট পেপারে সাধারণ সিল: সৌদি সরকার এখন কোনো সাদা কাগজে কাগজি সিল দেওয়া কাজের অফার লেটার অনুমোদন করে না। প্রতিটি অফার লেটার কিওয়া সিস্টেমে জেনারেট হতে হয়।
  • বেতনের অসঙ্গতি: সাধারণ ক্লিনার, কৃষি কর্মী বা হেল্পার পদে প্রতি মাসে ২০০০ থেকে ৩০০০ রিয়াল বেতন এবং ফ্রি খাবার-থাকার প্রতিশ্রুতি থাকলে তা শতভাগ ভুয়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
  • অফিশিয়াল বারকোড অনুপস্থিতি: ভিসা ডকুমেন্টের নিচে যদি ১২৮-বিট সিকিউর বারকোড বা কিউআর কোড না থাকে, তবে তা ভুয়া কাগজ।
  • মোফায় ডাটা না থাকা: ভিসা যতই জেনুইন দেখাক, মোফা পোর্টালে অনুসন্ধান করে যদি ‘Application Not Found’ বার্তা আসে, তবে এজেন্সিকে কোনো অগ্রিম অর্থ দেবেন না।

জাল ও ভুয়া ভিসা পরীক্ষার জন্য বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি জানতে আমাদের মাস্টার পিলার গাইড আসল ও ভুয়া বা জাল ভিসা চেনার সার্বিক উপায় অবিলম্বে সম্পূর্ণ পড়ে নিন।


৭. বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. কিওয়া সিস্টেমে কন্ট্রাক্ট দেখতে কতদিন সময় লাগে?

কোম্পানি আবেদন সাবমিট করার সাথে সাথেই একটি প্রি-কন্ট্রাক্ট নম্বর তৈরি হয়। সাধারণত দূতাবাস স্ট্যাম্পিংয়ের ৩ থেকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে এটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়ে লাইভ ডাটাবেজে প্রদর্শিত হয়।

২. সৌদি আরবে ফ্রি ভিসা বলে কোনো ভিসা সরকারিভাবে প্রচলিত আছে কি?

না, সৌদি আরবের শ্রম আইনে ‘ফ্রি ভিসা’ (Free Visa) বলে কোনো আইনি অস্তিত্ব নেই। এটি দালালদের তৈরি একটি অবৈধ পরিভাষা। কোনো কাফিলের অধীনে ভিসা নিয়ে অন্য জায়গায় স্বাধীনভাবে কাজ করা সৌদি শ্রম আইনের ৩৯ নম্বর ধারার অধীনে মারাত্মক শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

৩. কিওয়া চুক্তির বাইরে কাফিল কি অতিরিক্ত সময় কাজ করাতে পারে?

সৌদি শ্রম আইন অনুযায়ী দৈনিক সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টার অতিরিক্ত কাজ করালে কোম্পানিকে মূল বেতনের দেড়গুণ (১৫০%) হারে ওভারটাইম ভাতা প্রদান করতে হবে। চুক্তিপত্রে তা স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ থাকে।

৪. ইকামা না হলে কি সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরত আসা যায়?

ইকামা না হলে কর্মী বেআইনি মর্যাদায় পড়েন। তবে সৌদি শ্রম আদালতে (Labour Court) অভিযোগ দায়ের করে বা বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় ‘খুরুজ নেহায়ি’ (Final Exit) নিয়ে দেশে ফেরা সম্ভব।

৫. কাজের ভিসা প্রসেসিংয়ে প্রতারিত হলে কোথায় অভিযোগ করবেন?

দালাল বা এজেন্সির মাধ্যমে প্রতারিত হলে ঢাকার ইস্কাটনে অবস্থিত জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (BMET) অভিযোগ সেল অথবা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হেল্পলাইনে প্রমাণসহ সরাসরি লিখিত অভিযোগ দাখিল করতে পারবেন।

৬. সৌদি কাজের ভিসা চেকের জন্য কি কোনো ফি দিতে হয়?

না, সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা কিওয়া প্ল্যাটফর্মে পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে যেকোনো ভিসা ও চুক্তিপত্র নিরীক্ষা করা সম্পূর্ণ ফ্রি ও নাগরিক অধিকার।